মমতাদি

মমতাদি
                                              মানিক বন্যোপাধ্যায়


মূলপাঠ   
শীতের সকাল। রোদে বসে আমি স্কুলের পড়া করছি, মা কাছে বসে ফুলকপি কুটছেন। সে এসেই বলল, আপনার রান্নার জন্য লোক রাখবেন? আমি ছোট ছেলে-মেয়েও রাখব। 
নিঃসঙ্কোচ আবেদন।🔒ব্যাখ্যা বোঝা গেল সঙ্কোচ অনেক ছিল, প্রাণপণ চেষ্টায় অতিরিক্ত জয় করে ফেলেছে।🔒ব্যাখ্যা তাই যেটুকু সঙ্কোচ নিতান্তই থাকা উচিত তাও এর নেই।🔒ব্যাখ্যা 
বয়স আর কত হবে, বছর তেইশ। পরনে সেলাই করা ময়লা শাড়ি, পাড়টা বিবর্ণ লাল। সীমান্ত পর্যন্ত ঘোমটা, ঈষৎ বিশীর্ণ মুখে গাঢ় শ্রান্তির ছায়া,🔒ব্যাখ্যা স্থির অচঞ্চল দুটি চোখ। কপালে একটি ক্ষত-চিহ্ন-আন্দাজে পরা টিপের মতো। 🔒ব্যাখ্যা  
মা বললেন, তুমি রাঁধুনী? 🔒ব্যাখ্যা
চমকে তার মুখ লাল হলো।🔒ব্যাখ্যা সে চমক ও লালিমার বার্তা বোধহয় মার হৃদয়ে পৌঁছল, কোমল স্বরে বললেন, বোসো বাছা। 
সে বসল না। অনাবশ্যক জোর দিয়ে বলল, হ্যাঁ আমি রাঁধুনী।🔒ব্যাখ্যা আমায় রাখবেন? আমি রান্না ছাড়া ছোট ছোট কাজও করব। 
মা তাকে জেরা করলেন। দেখলাম সে ভারি চাপা।🔒ব্যাখ্যা মার প্রশ্নের ছাঁকা জবাব দিল, নিজে থেকে একটি কথা বেশি কইল না। সে বলল, তার নাম মমতা। আমাদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে জীবনময়ের গলি, গলির ভেতরে সাতাশ নম্বর বাড়ির একতলায় সে থাকে। তার স্বামী আছে আর একটি ছেলে। স্বামীর চাকরি নেই চারমাস, সংসার আর চলে না, সে তাই পর্দা ঠেলে উপার্জনের জন্য বাইরে এসেছে।🔒ব্যাখ্যা এই তার প্রথম চাকরি। মাইনে? সে তা জানে না। দুবেলা রেঁধে দিয়ে যাবে, কিন্তু খাবে না। 🔒ব্যাখ্যা
পনের টাকা মাইনে ঠিক হলো। সে বোধহয় টাকা বারো আশা করেছিল, কৃতজ্ঞতায় দুচোখ সজল হয়ে উঠল।🔒ব্যাখ্যা কিন্তু সমস্তটুকু কৃতজ্ঞতা সে নীরবেই প্রকাশ করল, কথা কইল না। 
মা বললেন, আচ্ছা, তুমি কাল সকাল থেকে এসো। 
সে মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ চলে গেল। আমি গেটের কাছে তাকে পাকড়াও করলাম। 
শোন। এখুনি যাচ্ছ কেন? রান্নাঘর দেখবে না? আমি দেখিয়ে দিচ্ছি এসো। 
কাল দেখবো, বলে সে এক সেকেন্ড দাঁড়াল না, আমায় তুচ্ছ করে দিয়ে চলে গেল।🔒ব্যাখ্যা ওকে আমার ভালো লেগেছিল, ওর সঙ্গে ভাব করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তবু, আমি ক্ষুণ্ণ হয়ে মার কাছে গেলাম।🔒ব্যাখ্যা একটা বিস্মিত হয়েও। যার অমন মিষ্টি গলা, চোখে মুখে যার উপচে পড়া স্নেহ, তার ব্যবহার এমন রূঢ়🔒ব্যাখ্যা 
মা বললেন, পিছনে ছুটেছিলি বুঝি ভাব করতে? ভাবিস না, তোকে খুব ভালোবাসবে🔒ব্যাখ্যা। বার বার তোর দিকে এমন করে তাকাচ্ছিলো! 
শুনে খুশি হলাম। রাঁধুনী পদপ্রার্থিনীর স্নেহ সেদিন অমন কাম্য মনে হয়েছিল কেন বলতে পারি না। 
পরদিন সে কাজে এল। নীরবে নতমুখে কাজ করে গেল।🔒ব্যাখ্যা যে বিষয়ে উপদেশ পেল পালন করল, যে বিষয়ে উপদেশ পেল না নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করল— অনর্থক প্রশ্ন করল না, নির্দেশের অভাবে কোনো কাজ ফেলে রাখল না। সে যেন বহুদিন এবাড়িতে কাজ করছে বিনা আড়ম্বরে এমন নিখুঁত হলো তার কাজ। 
কাজের শৃঙ্খলা ও ক্ষিপ্রতা দেখে সকলে তো খুশি হলেন, মার ভবিষ্যৎ বাণী সফল করে সে যে আমায় খুব ভালোবাসবে তার কোনো লক্ষণ না দেখে আমি হলাম ক্ষুণ্ণ। দুবার খাবার জল চাইলাম, চার পাঁচ বার রান্না ঘরে দিয়ে দাঁড়ালাম, কিন্তু কিছুতেই সে আমায় ভালোবাসল না। বরং রীতিমতো উপেক্ষা করল।🔒ব্যাখ্যা শুধু আমাকে নয় সকলকে। কাজগুলিকে সে আপনার করে নিল, মানুষগুলির দিকে ফিরেও তাকাল না।🔒ব্যাখ্যা মার সঙ্গে মৃদুস্বরে দুএকটি দরকারী কথা বলা ছাড়া ছটা থেকে বেলা সাড়ে দশটা অবধি একবার কাশির শব্দ পর্যন্ত করল না। সে যেন ছায়াময়ী মানবী,🔒ব্যাখ্যা ছায়ার মতোই ম্লানিমার ঐশ্বর্যে মহীয়সী কিন্তু ধরা ছোঁয়ার অতীত শব্দহীন অনুভূতিহীন নির্বিকার।🔒ব্যাখ্যা 
রাগ করে আমি স্কুলে চলে গেলাম।🔒ব্যাখ্যা সে কি করে জানবে মাইনে করা রাঁধুনীর দূরে থাকাটাই সকলে তার কাছে আশা করছে না, তার সঙ্গে কথা কইবার জন্য বাড়ির ছোটকর্তা ছটফট করেছে! 
সপ্তাহখানেক নিজের নতুন অবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সে আমার সঙ্গে ভাব করল। 
বাড়িতে সেদিন কুটুম এসেছিল, সঙ্গে এসেছিল এক গাদা রসগোল্লা আর সন্দেশ। প্রকাশ্য ভাগটা প্রকাশ্যে খেয়ে ভাঁড়ার ঘরে গোপন ভাগটা মুখে পুরে চলেছি,🔒ব্যাখ্যা কোথা থেকে সে এসে খপ করে হাত ধরে ফেলল। রাগ করে মুখের দিকে তাকাতে সে এমন ভাবে হাসল যে লজ্জা পেলাম। 
বলল, দরজার পাশ থেকে দেখছিলাম, আর কটা খাচ্ছ গুনছিলাম। যা খেয়েছ তাতেই বোধহয় অসুখ হবে, আর খেয়ো না। কেমন? 
ভর্ৎসনা নয়, আবেদন। মার কাছে ধরা পড়লে বকুনি খেতাম এবং এক খাবলা খাবার তুলে নিয়ে ছুটে পালাতাম। এর আবেদনে হাতের খাবার ফেলে দিলাম। সে বলল, লক্ষ্মী ছেলে। এসে জল খাবে। 
বাড়ির সকলে কুটুম নিয়ে অন্যত্র ব্যস্ত ছিল, জল খেয়ে আমি রান্না ঘরে আসন পেতে তার কাছে বসলাম। এতদিন তার গম্ভীর মুখই শুধু দেখেছিলাম, আজ প্রথম দেখলাম, সে নিজের মনে হাসছে। 🔒ব্যাখ্যা
আমি বললাম, বামুনদি— 🔒ব্যাখ্যা
সে চমকে হাসি বন্ধ করল। এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি তাকে গাল দিয়েছি। বুঝতে না পেরেও অপ্রতিভ হলাম। 
কি হলো বামুনদি? 
সে এদিক ওদিক তাকাল। ডালে খানিকটা নুন ফেলে দিয়ে এসে হঠাৎ আমার গা ঘেঁষে বসে পড়ল। গম্ভীর মুখে বলল, আমায় বামুনদি বোলো না খোকা। 🔒ব্যাখ্যা শুধু দিদি বোলো। তোমার মা রাগ করবেন দিদি বললে? 
আমি মাথা নাড়লাম। সে ছোট এক নিঃশ্বাস ফেলে আমাকে এত কাছে টেনে নিল যে আমার প্রথম ভারি লজ্জা করতে লাগল। 
তারপর কিছুক্ষণ আমাদের যে গল্প চলল সে অপূর্ব কথোপকথন মনে করে লিখতে পারলে সাহিত্যে না হোক আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান লেখা হয়ে উঠত। 
হঠাৎ মা এলেন। সে দুহাতে আমাকে একরকম জড়িয়েই ধরে ছিল, হাত সরিয়ে ধরা পড়া চোরের মতো হঠাৎ বিব্রত হয়ে উঠল, দুচোখে ভয় দেখা দিল। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণে আমার কপালে চুম্বন করে মাকে বলল, এত কথা কইতে পারে আপনার ছেলে। 
তখন বুঝিনি, আজ বুঝি স্নেহে সে আমায় আদর করেনি, নিজের গর্ব প্রতিষ্ঠার লোভে। মা যদি বলতেন, খোকা উঠে আয়,— যদি কেবল মুখ কালো করে সরে যেতেন, পরদিন থেকে সে আর আসত না। পনের টাকার খাতিরেও না, স্বামীপুত্রের অনাহারের তাড়নাতেও না। 
মা হাসলেন। বললে, ও ওইরকম। সারাদিন বকবক করে। বেশি আস্কারা দিও না, জ্বালিয়ে মারবে।🔒ব্যাখ্যা বলে মা চলে গেলেন। তার দুচোখ দিয়ে দুফোঁটা দুর্বোধ্য রহস্য টপ টপ করে ঝরে পড়ল।🔒ব্যাখ্যা মা অপমান করলে তার চোখ হয়তো শুকনোই থাকত, সম্মানে, চোখের জল ফেলল! সে সম্মানের আগাগোড়া করুণা ও দয়া মাখা ছিল, সেটা বোধহয় তার সইল না। 🔒ব্যাখ্যা
তিন চার দিন পরে তার গালে তিনটে দাগ দেখতে পেলাম। মনে হয়, আঙ্গুলের দাগ। মাস্টারের চড় খেয়ে একদিন অবনীর গালে যে রকম দাগ হয়েছিল তেমনি। আমি ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করলাম, তোমার গালে আঙ্গুলের দাগ কেন? কে চড় মেরেছে? 
সে চমকে গালে হাত চাপা দিয়া বলল, দূর! তারপর হেসে বলল, আমি নিজে মেরেছি! কাল রাত্রে গালে একটা মশা বসেছিল, খুব রেগে— 
মশা মারতে গালে চড়! বলে আমি খুব হাসলাম। সেও প্রথমটা আমার সঙ্গে হাসতে আরম্ভ করে গালে হাত ঘষতে ঘষতে আনমনা ও গম্ভীর হয়ে গেল। তার মুখ দেখে আমারও হাসি বন্ধ হয়ে গেল। চেয়ে দেখলাম, ভাতের হাঁড়ির বুদবুদফাটা বাষ্পে কি দেখে যেন তার চোখ পলক হারিয়েছে, নিচের ঠোঁট দাঁতে দাঁতে কামড়ে ধরেছে, বেদনায় মুখ হয়েছে কালো। 
সন্দিগ্ধ হয়ে বললাম, তুমি মিথ্যে বলছ দিদি। তোমায় কেউ মেরেছে। 
সে হঠাৎ কাঁদ কাঁদ হয়ে বলল, না ভাই, না। সত্যি বলছি না। কে মারবে? 
এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে না পেয়ে আমাকে চুপ করে থাকতে হলো। তখন কি জানি তার গালে চড় মারার অধিকার একজন মানুষের আঠার আনা আছে!🔒ব্যাখ্যা  কিন্তু চড় যে কেউ একজন মেরেছে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ ঘুচল না। শুধু দাগ নয়, তার মুখ চোখের ভাব, তার কথার সুর সমস্ত আমার কাছে ওকথা ঘোষণা করে দিল। বিবর্ণ গালে তিনটি রক্তবর্ণ দাগ দেখতে দেখতে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি গালে হাত বুলিয়ে দিতে গেলাম, কিন্তু সে আমার হাতটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল।
চুপি চুপি বলল, কারো কাছে যা পাই না, তুমি তা দেবে কেন? 🔒ব্যাখ্যা
আমি অবাক হয়ে বললাম, কি দিলাম আমি? 
এ প্রশ্নের জবাব পেলাম না। হঠাৎ সে তরকারী নামাতে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পিঁড়িতে বসামাত্র খোঁপা খুলে পিঠ ভাসিয়া একরাশি চুল মেঝে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল কি একটা অন্ধকার রহস্যের আড়ালে সে যেন নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। 🔒ব্যাখ্যা
রহস্য বৈকি। গালে চড়ের দাগ, চিরদিন যে ধৈর্যময়ী ও শান্ত তার ব্যাকুল কাতরতা, ফিসফিস করে ছোট ছেলেকে শোনানো; কারও কাছে যা পাই না তুমি তা দেবে কেন? বুদ্ধির পরিমাণের তুলনায় এর চেয়ে বড় রহস্য আমার জীবনে কখনো দেখা দেয়নি! ভেবেচিন্তে আমি তার চুলগুলি নিয়ে বেণী পাকাবার চেষ্টা আরম্ভ করে দিলাম। আমার আশা পূর্ণ হলো সে মুখ ফিরিয়ে হেসে রহস্যের ঘোমটা খুলে সহজ মানুষ হয়ে গেল। 
বিকালে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, তোমার বরের চাকরি হলে তুমি কি করবে? 
তুমি কি করতে বল? হরির লুট দেব? না তোমায় সন্দেশ খাওয়াব। 
ধেৎ তা বলছি না। তোমার বরের চাকরি নেই বলে আমাদের বাড়ি কাজ করছ তো চাকরি হলে করবে না? 
সে হাসল, করব। এখন করছি যে! 
তোমার বরের চাকরি হয়েছে। 
হয়েছে বলে সে গম্ভীর হয়ে গেল। 
আহা স্বামীর চাকরি নেই বলে ভদ্রলোকের মেয়ে কষ্টে পড়েছে, পাড়ার মহিলাদের কাছে মার এই মন্তব্য শুনে মমতাদির বরের চাকরির জন্য আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠেছিলাম। তার চাকরি হয়েছে শুনে পুলকিত হয়ে মাকে সংবাদটা শুনিয়ে দিলাম।🔒ব্যাখ্যা 
মা তাকে ডেকে পাঠালেন, তোমার স্বামীর চাকরি হয়েছে? 
সে স্বীকার করে বলল, হয়েছে। বেশি দিন নয়, ইংরাজি মাসের পয়লা থেকে। 
মা বললেন, অন্য লোক ঠিক করে দিতে পারছ না বলে কি তুিম কাজ ছেড়ে দিতে ইতস্তত করছ? তার কোনো দরকার নেই। আমরা তোমায় আটকে রাখব না। তোমার কষ্ট দূর হয়েছে তাতে আমরাও খুব সুখী। তুমি ইচ্ছে করলে এবেলাই কাজ ছেড়ে দিতে পার, আমাদের অসুবিধা হবে না। 
তার চোখে জল এল, সে শুধু বলল, আমি কাজ করব। 🔒ব্যাখ্যা
মা বললেন, স্বামীর চাকরি হয়েছে তবু? 
সে বলল, তাঁর সামান্য চাকরি, তাতে কুলবে না মা। আমায় ছাড়বেন না। আমার কাজ কি ভালো হচ্ছে না? 
মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, অমন কথা তোমার শত্রুও বলতে পারবে না মা।🔒ব্যাখ্যা সেজন্য নয়। তোমার কথা ভেবেই আমি বলছিলাম। তোমার ওপর মায়া বসেছে, তুমি চলে গেলে আমাদেরও কি ভালো লাগবে? 
সে একরকম পালিয়ে গেল। আমি তার পিছু নিলাম। রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম সে কাঁদছে। আমায় দেখে চোখ মুছল।
আচমকা বলল, মিথ্যে বললে কি হয় খোকা? 🔒ব্যাখ্যা
মিথ্যে বললে কি হয় জানতাম। বললাম, পাপ হয়। 
গুরুনিন্দা বাঁচাতে মিথ্যে বললে? 
এটা জানতাম না। গুরুনিন্দা পাপ, মিথ্যা বলা পাপ। কোনটা বেশি পাপ সে জ্ঞান আমার জন্মায়নি।🔒ব্যাখ্যা কিন্তু না জানা কথা বলেও সান্ত্বনা দেওয়া চলে দেখে বললাম, তাতে একটুও পাপ হয় না। সত্যি! কাঁদছ কেন? 
তখন তার চাকরির একমাস বোধহয় পূর্ণ হয়নি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরবার সময় দেখলাম জীবনময়ের গলির মোড়ে ফেরিওয়ালার কাছে কমলা লেবু কিনছে। 
সঙ্গে নেবার ইচ্ছ নেই টের পেয়েও এক রকম জোর করেই বাড়ি দেখতে গেলাম। দুটি লেবু কিনে আমাকে সঙ্গে নিয়ে সে গলিতে ঢুকল। বিশ্রী নোংরা গলি। কে যে ঠাট্টা করে এই যমালয়ের পথটার নাম জীবনময় লেন রেখেছিল! গলিটা আস্ত ইট দিয়ে বাঁধানো, পায়ে পায়ে ক্ষয় হয়ে গেছে। দুদিকের বাড়ির চাপে অন্ধকার, এখানে ওখানে আবর্জনা জমা করা আর একটা দূষিত চাপা গন্ধ। আমি সঙ্কুচিত হয়ে তার সঙ্গে চলতে লাগলাম। সে বলল, মনে হচ্ছে পাতালে চলেছ, না?🔒ব্যাখ্যা 
সাতাশ নম্বরের বাড়িটা দোতলা নিশ্চয়, কিন্তু যত ক্ষুদ্র দোতলা হওয়া সম্ভব। সদর দরজার পরেই ছোট একটি উঠান, মাঝামাঝি কাঠের প্রাচীর দিয়ে দুভাগ করা। নিচে ঘরের সংখ্যা বোধহয় চার, কারণ মমতাদি আমায় যেভাগে নিয়ে গেল সেখানে দুখানা ছোট ছোট কুঠরির বেশি কিছু আবিষ্কার করতে পারলাম না। ঘরের সামনে দুহাত চওড়া একটু রোয়াক, একপাশে একশিট করোগেট আয়রনের ছাদ ও চটের বেড়ার অস্থায়ী রান্নাঘর। চটগুলি কয়লার ধোঁয়ায় কয়লার বর্ণ পেয়েছে। 
সে আমাকে শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে টুলে বসাল। ঘরে দুটি জানালা আছে এবং সম্ভবত সেই কারণেই শোবার ঘর করে অন্য ঘরখানার চেয়ে বেশি মান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জানালা দুটির এমনি অবস্থান যে আলো যদিও কিছু কিছু আসে, বাতাসের আসা যাওয়া একেবারে অসম্ভব। সুতরাং পক্ষপাতিত্বের যে খুব জোরালো কারণ ছিল তা বলা যায় না। সংসারের সমস্ত জিনিসই প্রায় এঘরে ঠাঁই পেয়েছে। সব কম দামী শ্রীহীন জিনিস। এই শ্রীহীনতার জন্য সযত্নে গুছিয়ে রাখা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে বিশৃঙ্খলতার অন্ত নেই।🔒ব্যাখ্যা একপাশে বড় চৌকি, তাতে গুটানো মলিন বিছানা। চৌকির তলে একটি চরকা আর ভাঙ্গা বেতের বাস্কেট চোখে পড়ে, অন্তরালে হয়তো আরও জিনিস আছে। ঘরের এক কোণে পাশাপাশি রক্ষিত দুটি ট্রাংক— দুটিরই রঙ চটে গেছে, একটির তালা ভাঙ্গা। অন্য কোণে কয়েকটা মাজা বাসন, বাসনের ঠিক ঊর্ধ্বে কোনাকুনি টাঙ্গানো দড়িতে খানকয়েক কাপড়। এই দুই কোণের মাঝামাঝি দেওয়াল ঘেঁষে পাতা একটি ভাঙ্গা টেবিল, আগাগোড়া দড়ির ব্যান্ডেজের জোরে কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে। টেবিলে কয়েকটা বই খাতা, একটি অল্প দামী টাইমপিস, কয়েকটা ওষুধের শিশি, একটা মেরামত করা আর্সি, কয়েকটা ভাঁজ করা সংবাদপত্র, এই সব টুকিটাকি জিনিস। টেবিলের ঊর্ধ্বে দেওয়ালের গর্তের তাকে কতকগুলি বই। 
ঘরে আর একটি জিনিস ছিল— একটি বছর পাঁচেকের ছেলে। চৌকিতে শুধু মাদুরের ওপরে উপুড় হয়ে শুয়ে সে ঘুমিয়ে ছিল। মমতাদি ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে ছেলেটির গায়ে হাত দিল, তারপর গুটানো বিছানার ভেতর থেকে লেপ আর বালিশ টেনে বার করল। সন্তর্পণে ছেলেটির মাথার তলে বালিশ দিয়ে লেপ দিয়ে গা ঢেকে দিল। 
বলল, কাল সারারাত পেটের ব্যথায় নিজেও ঘুমোয়নি, আমাকেও ঘুমোতে দেয়নি। উনি তো রাগ করে— কই, তুমি লেবু খেলে না।? 
আমি একটা লেবু খেলাম। সে চুপ করে খাওয়া দেখে বলল, মুড়ি ছাড়া ঘরে কিছু নেই, দোকানের বিষও দেব না, একটা লেবু খাওয়াতে তোমাকে ডেকে আনলাম! 
আমি বললাম, আর একটা লেবু খাব দিদি। 
সে হেসে লেবু দিল, বলল, কৃতার্থ হলাম। সবাই যদি তোমার মতো ভালোবাসত! 🔒ব্যাখ্যা
ঘরে আলো ও বাতাসের দীনতা ছিল। খানিক পরে সে আমায় বাইরে রোয়াকে মাদুর পেতে বসাল।🔒ব্যাখ্যা কথা বলার সঙ্গে সংসারের কয়েকটা কাজও করে নিল। ঘর ঝাঁট দিল, কড়াই মাজল, পানি তুলল, তারপর মশলা বাটতে বসল। হঠাৎ বলল, তুমি এবার বাড়ি যাও ভাই। তোমার খিদে পেয়েছে।🔒ব্যাখ্যা
                                                                                                                                                                     

উত্তর : _

উত্তর : _


উত্তর : দিবারাত্রির কাব্য।

উত্তর : মমতাদির কপালের ক্ষতচিহ্নটি আন্দাজে পরা টিপের মতো।

উত্তর : মমতাদি জীবনময়ের গলিতে থাকত।

উত্তর : ‘মমতাদি’ গল্পের উৎস ‘সরীসৃপ’ গ্রন্থ। 

উত্তর : মমতাদির বেতন ১৫ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল।


উত্তর :
‘নিঃসংকোচ আবেদন’ বলতে নিজের প্রয়োজনের কথা কোনো দ্বিধা না রেখে সরাসরি বলা।
‘মমতাদি’ গল্পে মমতাদিকে দেখা যায় একটি বাড়িতে এসে গৃহকত্রীর কাছে সরাসরি জানতে চান যে, তাদের কোনো রান্নার লোক লাগবে কিনা। এমনকি মমতাদিও এও প্রতিশ্রুতি দেন যে, রান্না করার পাশাপাশি তিনি বাড়ির ছোট শিশু থাকলে তাদেরও দেখাশুনা করবেন। যেহেতু এ কাজ মমতাদি এর আগে কখনো করেননি, সে কারণে তার সংকোচ ছিল। তবে সেই সংকোচ তিনি জয় করেছেন। তাই তিনি নিঃসংকোচে জানতে চেয়েছেন- তাকে রান্নার কাজে তারা রাখবেন কিনা।


উত্তর :
মমতাদির কথা বলার ভঙ্গি দেখেই ছেলেটি বুঝল যে তার মনে অনেক সংকোচ ছিল।
নিতান্ত দায়ে পড়ে মমতাদি স্কুলপড়–য়া ছেলেটির বাড়িতে রান্নার কাজ চাইতে এসেছিল। ভদ্রঘরের মেয়ে বলে মমতাদি জানত না যারা অন্যের বাড়িতে কাজ করে তারা কীভাবে কথা বলে। তাই নিজের সম্পর্কে কিছু না বলেই সে ছেলেটির মেয়ের কাছে রাঁধুনী রাখার জন্য বলল। তার কথা বলার এ ভঙ্গিই থেকেই ছেলেটি তার মনের সংকেচটি বুঝতে পারল।


উত্তর :
 মমতাদি সম্পর্কে লেখক উক্ত কথাটি বলেছেন। 
‘মমতাদি গল্পের মমতাদি ভদ্রঘরের মেয়ে। অভাবে পড়ে তাকে একটি বাড়িতে রাঁধুনীর কাজ নিতে হয়েছিল। তার এই কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে হয়ে এই কাজ করার জন্য তার প্রথমে সংকোচ ছিল। কিন্তু অভাবের তাড়নায় সে তার সংকোচকে অনেক দূরে দিয়েছিল। এখানে এ বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে। 



উত্তর :
ছেলেটির মা যেন তাকে রাঁধুনী হিসেবে কাজে রাখে এজন্য অনাবশ্যক জোর দিয়ে সে বলেছিল যে সে রাঁধুনী। 
মমতাদি জানে যে অভিজ্ঞ রাঁধুনীদেরই বাড়ির লোকেরা কাজে রাঁখে। যার রাঁধুনীর কাজের অভিজ্ঞতা নেই বা অভ্যাস নেই, তাকে কেউ সহজে রাখতে চায় না। কিন্তু রাঁধুনীর কাজটি মমতাদির বেঁচে থাকার জন্য খুব প্রয়োজন ছিল। তাই ছেলেটির মাকে বিশ্বাস করানোর জন্য সে অনাবশ্যক জোর দিয়ে বলেছে যে সে রাঁধুনী।


উত্তর :
 অর্থনৈতিক দুরবস্থার কবলে পড়ে যেটুকু সংকোচ থাকা উচিত তাও মমতার নেই।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মমতাদি’ গল্পে মমতার সংকোচ বলতে পেশাদার গৃহকর্মী না হয়েও কাজের সন্ধান করাকে বোঝানো হয়েছে। মমতা প্রথম কাজের সন্ধানে এসেছে। তার একটু সংকোচ থাকা দরকার ছিল। কিন্তু অভাবের তাড়নায় মমতার সংকোচ উঠে গেছে এবং তা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে যেটুকু দ্বিধা নিতান্তই থাকা দরকার তাও যেন মমতার মধ্যে লক্ষ করা যায় না। মন থেকে সে সংকোচ দূর করেই কাজের সন্ধানে এসেছে। তাই মমতাকে এমন নিঃসংকোচ মনে হয়েছে।




Score Board

১)

‘সবাই যদি তোমার মত ভালোবাসতো’- বাক্যটিতে প্রকাশ পেয়েছে মমতাদির-

২) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র একুশ বছর বয়সে কোন উপন্যাস রচনা করেন?

৩) ছোট মেয়ে লিজা গৃহকর্মী পারুলকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে চায় না। পারুল একটু চোখের আড়াল হলেই সে কান্না শুরু করে দেয়। পারুল তাকে অত্যন্ত আদর করে। উদ্দীপকের ‘লিজার’ সাথে ‘মমতাদি’ গল্পের কোন চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে?

৪) ‘দৈন্য যদি আসে আসুক, লজ্জা কিবা তাহে মাথা উঁচু রাখিস।’- এ বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায় কোন চরিত্রটির মধ্যে?

৫) কোন গ্রন্থ থেকে ‘মমতাদি’ গল্পটি সংকলন করা হয়েছে?

Score Board