প্রবাস বন্ধু

প্রবাস বন্ধু
সৈয়দ মুজতবা আলী

লেখক-পরিচিতি
নাম: সৈয়দ মুজতবা আলী।
জন্ম: ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ। জন্মস্থান: আসামের করিমগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস: মৌলভীবাজার।
শিক্ষাজীবন: নবম শ্রেণি পর্যন্ত সিলেট গর্ভমেন্ট হাই স্কুলে পড়ার পর পাঁচ বছর শান্তি নিকেতনের স্কুল বিভাগে পড়াশোনা এবং ১৯২৬ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে কিছুকাল অধ্যয়ন। পরবর্তীতে বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন এবং ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ।
পেশা
অধ্যক্ষ: ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। অধ্যাপনা: মিশরের আল আজাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ও মহীশূরের বরোদা কলেজে অধ্যাপনা করেন।
সাহিত্য সাধনা: উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ: দেশে-বিদেশে, পঞ্চতন্ত্র, চাচা কাহিনী, ময়ূরকণ্ঠী, শবনম ইত্যাদি। 
মৃত্যু: ১৯৭৪ সালে ১০ই ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

মূলপাঠ
বাসা পেলুম কাবুল থেকে আড়াই মাইল দূরে খাজামোল্লা গ্রামে। বাসার সঙ্গে সঙ্গে চাকরও পেলুম। অধ্যক্ষ জিরার জাতে ফরাসি। কাজেই কায়দামাফিক আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এর নাম আবদুর রহমান। আপনার সব কাজ করে দেবে- জুতো বুরুশ থেকে খুনখারাবি।🔒ব্যাখ্যা অর্থাৎ ইনি ‘হরফন-মৌলা’ বা ‘সকল কাজের কাজি’।🔒ব্যাখ্যা
জিরার সায়েব কাজের লোক, অর্থাৎ সমস্ত দিন কোনো-না-কোনো মন্ত্রীর দপ্তরে ঝগড়া-বচসা করে কাটান।🔒ব্যাখ্যা কাবুলে এরই নাম কাজ। ‘ওরভোয়া, বিকেলে দেখা হবে' বলে চলে গেলেন।
কাবুল শহরে আমি দুটি নরদানব দেখেছি।🔒ব্যাখ্যা তার একটি আবদুর রহমান।
পরে ফিতে দিয়ে মেপে দেখেছিলুম ছ ফুট চার ইঞ্চি। উপস্থিত লক্ষ করলুম লম্বাই মিলিয়ে চওড়াই। দুখানা হাত হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে আঙুলগুলো দু কাঁদি মর্তমান কলা হয়ে ঝুলছে। পা দুখানা ডিঙি নৌকার সাইজ। কাঁধ দেখে মনে হলো, আমার বাবুর্চি আবদুর রহমান না হয়ে সে যদি আমীর আবদুর রহমান হত তবে অনায়াসে গোটা আফগানিস্তানের ভার বইতে পারত।🔒ব্যাখ্যা এ কান ও কান জোড়া মুখ— হ্যাঁ করলে চওড়াচওড়ি কলা গিলতে পারে। এবড়ো-থেবড়ো নাক-কপাল নেই। পাগড়ি থাকায় মাথার আকার-প্রকার ঠাহর হলো না, তবে আন্দাজ করলুম বেবি সাইজের হ্যাটও কান অবধি পৌঁছবে।
রং ফর্সা, তবে শীতে গ্রীষ্মে চামড়া চিরে ফেঁড়ে গিয়ে আফগানিস্তানের রিলিফ ম্যাপের চেহারা ধরেছে।🔒ব্যাখ্যা দুই গাল কে যেন থাবড়া মেরে লাল করে দিয়েছে- কিন্তু কার এমন বুকেট পাটা? রুজও তো মাখবার কথা নয়।
পরনে শিলওয়ার, কুর্তা আর ওয়াসকিট।
ঠোঁট দুটি দেখতে পেলুম না। সেই যে প্রথম দিন ঘরে ঢুকে কার্পেটের দিকে নজর রেখে দাঁড়িয়েছিল, শেষ দিন পর্যন্ত ঐ কার্পেটের অপরূপ রূপ থেকে তাকে বড়ো একটা চোখ ফেরাতে দেখিনি।🔒ব্যাখ্যা গুরুজনদের দিকে তাকাতে নেই, আফগানিস্তানেও নাকি এই ধরনের একটা সংস্কার আছে।
তবে তার নয়নের ভাবের খেলা গোপনে দেখেছি।🔒ব্যাখ্যা দুটো চিনেমাটির ডাবরে যেন দুটো পান্তুয়া ভেসে উঠেছে।
জরিপ করে ভরসা পেলুম, ভয়ও হলো। এ লোকটা ভীমসেনের মতো রান্না তো করবেই, বিপদে- আপদে ভীমসেনেরই মতো আমার মুশকিল আসান হয়ে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন, এ যদি কোনোদিন বিগড়ে যায়? তবে?
রহমানকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘পূর্বে কোথায় কাজ করেছ?”
উত্তর দিল, ‘কোথাও না, পল্টনে ছিলুম, মেসের চার্জে। এক মাস হলো খালাস পেয়েছি।'
‘রাইফেল চালাতে পার?'
একগাল হাসল।
'কী কী রাঁধতে জানো?'
‘পোলাও, কোরমা, কাবাব, ফালুদা—।'
আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘ফালুদা বানাতে বরফ লাগে । এখানে বরফ তৈরি করার কল আছে?'
“কিসের কল?”
আমি বললুম, “তাহলে বরফ আসে কোত্থেকে?
বলল, ‘কেন, ঐ পাগমানের পাহাড় থেকে।' বলে জানলা দিয়ে পাহাড়ের বরফ দেখিয়ে দিল। তাকিয়ে দেখলুম, যদিও গ্রীষ্মকাল, তবু সবচেয়ে উঁচু নীল পাহাড়ের গায়ে সাদা সাদা বরফ দেখা যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে বললুম, ‘বরফ আনতে ঐ উঁচুতে চড়তে হয়?”
বলল, ‘না সায়েব, এর অনেক নিচে বড়ো বড়ো গর্তে শীতকালে বরফ ভর্তি করে রাখা হয়। এখন তাই খুঁড়ে তুলে গাধা বোঝাই করে নিয়ে আসা হয়।'
বুঝলুম, খবর-টবরও রাখে। বললুম, 'তা আমার হাঁড়িকুড়ি, বাসনকোসন তো কিছু নেই। বাজার থেকে সব কিছু কিনে নিয়ে এসো। রাত্তিরের রান্না আজ আর বোধ হয় হয়ে উঠবে না। কাল দুপুরে রান্না কোরো। সকালবেলা চা দিয়ো৷'
টাকা নিয়ে চলে গেল।
বেলা থাকতেই কাবুল রওনা দিলুম। আড়াই মাইল রাস্তা- মৃদুমধুর ঠান্ডায় গড়িয়ে গড়িয়ে পৌছব। পথে দেখি এক পবর্তপ্রমাণ বোঝা নিয়ে আবদুর রহমান ফিরে আসছে। জিজ্ঞেস করলুম, ‘এত বোঝা বইবার কি দরকার ছিল- একটা মুটে ভাড়া করলেই তো হত।'
যা বলল, তার অর্থ এই, সে যে-মোট বইতে পারে না, সে-মোট কাবুলে বইতে যাবে কে?
আমি বললুম, ‘দুজনে ভাগাভাগি করে নিয়ে আসতে।'
ভাব দেখে বুঝলুম, অতটা তার মাথায় খেলেনি, অথবা ভাববার প্রয়োজনবোধ করেনি।
বোঝাটা নিয়ে আসছিল জালের প্রকাণ্ড থলেতে করে। তার ভিতর তেল-নুন-লকড়ি সবই দেখতে পেলুম। আমি ফের চলতে আরম্ভ করলে বলল, ‘সায়েব রাত্রে বাড়িতেই খাবেন।'
খুব বেশি দূর যেতে হলো না। লব-ই-দরিয়া অর্থাৎ কাবুল নদীর পারে পৌছতে না পৌঁছতেই দেখি মসিয়ে জিরার টাঙা হাঁকিয়ে টগবগাবগ করে বাড়ি ফিরছেন।
কলেজের বড়কর্তা বা বস্ হিসাবে আমাকে তিনি বেশ দু-এক প্রস্থ ধমক দিয়ে বললেন, 'কাবুল শহরে নিশাচর হতে হলে যে তাগদ ও হাতিয়ারের প্রয়োজন, সে দুটোর একটাও তোমার নেই।'
বসকে খুশী করবার জন্য যার ঘটে ফন্দি-ফিকিরের অভাব, তার পক্ষে কোম্পানির কাজ হচ্ছে তর্ক না করা। বিশেষ করে যখন বসের উত্তমার্ধ তাঁরই পাশে বসে ‘উই, সার্তেনমা, এভিদামা, অর্থাৎ অতি অবশ্য, সার্টেনলি, এভিডেন্টলি', বলে তাঁর কথায় সায় দেন। ইংলন্ডে মাত্র একবার ভিক্টোরিয়া আলবার্ট আঁতাৎ হয়েছিল; শুনতে পাই ফ্রান্সে নাকি নিত্যি-নিত্যি, ঘরে ঘরে।
বাড়ি ফিরে এসে বসবার ঘরে ঢুকতেই আবদুর রহমান একটা দর্শন দিয়ে গেল এবং আমি যে তার তম্বীতেই ফিরে এসেছি, সে সম্বন্ধে আশ্বস্ত হয়ে হুট করে বেরিয়ে গেল।
তখন রোজার মাস নয়, তবু আন্দাজ করলুম সেহরির সময় অর্থাৎ রাত দুটোয় খাবার জুটলে জুটতেও পারে।
তন্দ্রা লেগে গিয়েছিল। শব্দ শুনে ঘুম ভাঙল। দেখি আবদুর রহমান মোগল তসবিরের গাড়ু-বদনার সমন্বয় আফতাবে বা ধারাযন্ত্র নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে। মুখ ধুতে গিয়ে বুঝলুম, যদিও গ্রীষ্মকাল, তবু কাবুল নদীর বরফ-গলা জলে কিছুদিন ধরে আমার মুখও আফগানিস্থানের রিলিফ ম্যাপের উঁচুনিচুর টক্করের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারবে।
খানা টেবিলের সামনে গিয়ে যা দেখলুম, তাতে আমার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না যে, আমার ভৃত্য আগা আবদুর রহমান এককালে মেসের চার্জে ছিলেন।
ডাবর নয়, ছোটখাটো একটা গামলাভর্তি মাংসের কোরমা বা পেঁয়াজ-ঘিয়ের ঘন ক্বাথে সেরখানেক দুম্বার মাংস— তার মাঝে মাঝে কিছু বাদাম কিসমিস লুকোচুরি খেলছে, এক কোণে একটি আলু অপাংক্তেয় হওয়ার দুঃখে ডুবে মরার চেষ্টা করছে। আরেক প্লেটে গোটা আষ্টেক ফুল বোম্বাই সাইজের শামী-কাবাব। বারকোশ থালায় এক ঝুড়ি কোফতা-পোলাও আর তার ওপরে বসে আছে একটি আস্ত মুর্গি-রোস্ট।
আমাকে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবদুর রহমান তাড়াতাড়ি এগিয়ে অভয়বাণী দিল- রান্নাঘরে আরো আছে।
একজনের রান্না না করে কেউ যদি তিনজনের রান্না করে, তবে তাকে ধমক দেওয়া যায়, সে যদি ছ'জনের রান্না পরিবেশন করে বলে রান্নাঘরে আরো আছে তখন আর কি করার থাকে? অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। 
রান্না ভালো, আমার ক্ষুধাও ছিল, কাজেই গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে কিছু কম খাইনি। তার ওপর অদ্য রজনী প্রথম রজনী এবং আবদুর রহমানও ডাক্তারি কলেজের ছাত্র যে রকম তন্ময় হয়ে মড়া কাটা দেখে, সেই রকম আমার খাওয়ার রকম-বহর দুই-ই-তার ডাবর-চোখ ভরে দেখে নিচ্ছিল।
আমি বললুম, ‘ব্যস! উৎকৃষ্ট রেঁধেছ আবদুর রহমান–।'
আবদুর রহমান অন্তর্ধান। ফিরে এল হাতে এক থালা ফালুদা নিয়ে। আমি সবিনয় জানালুম যে, আমি মিষ্টি পছন্দ করি না৷
আবদুর রহমান পুনরপি অন্তর্ধান। আবার ফিরে এল এক ডাবর নিয়ে- পেঁজা বরফের গুঁড়োয় ভর্তি । আমি বোকা বনে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘এ আবার কি?'
আবদুর রহমান উপরের বরফ সরিয়ে দেখাল নিচে আঙুর। মুখে বলল, “বাগেবালার বরফি আঙুর- তামাম আফগানিস্তানে মশহুর।' বলেই একখানা সসারে কিছু বরফ আর গোটা কয়েক আঙুর নিয়ে বসল৷ আমি আঙুর খাচ্ছি, ও ততক্ষণ এক-একটা করে হাতে নিয়ে সেই বরফের টুকরোয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অতি সন্তর্পণে ঘষে-মেয়েরা যে রকম আচারের জন্য কাগজি নেবু পাথরের শিলে ঘষেন। বুঝলুম, বরফ- ঢাকা থাকা সত্ত্বেও আঙুর যথেষ্ট হিম হয়নি বলে এই মোলয়েম কায়দা। ওদিকে তালু আর জিবের মাঝখানে একটা আঙুরে চাপ দিতেই আমার ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত ঝিনঝিন করে উঠছে। কিন্তু পাছে আবদুর রহমান ভাবে তার মনিব নিতান্ত জংলি তাই খাইবারপাসের হিম্মৎ বুকে সঞ্চয় করে গোটা আষ্টেক গিললুম। কিন্তু বেশিক্ষণ চালাতে পারলুম না; ক্ষান্ত দিয়ে বললুম, 'যথেষ্ট হয়েছে আবদুর রহমান, এবারে তুমি গিয়ে ভালো করে খাও।'
কার গোয়াল, কে দেয় ধুঁয়ো। এবারে আবদুর রহমান এলেন চায়ের সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে। কাবুলি সবুজ চা। পেয়ালায় ঢাললে অতি ফিকে হলদে রঙ দেখা যায়। সে চায়ে দুধ দেওয়া হয় না। প্রথম পেয়ালায় চিনি দেওয়া হয়, দ্বিতীয় পেয়ালায় তাও না। তারপর ঐ রকম, তৃতীয়, চতুর্থ- কাবুলিরা পেয়ালা ছয়েক খায়, অবশ্যি পেয়ালা সাইজে খুব ছোট, কফির পাত্রের মত।
চা খাওয়া শেষ হলে আবদুর রহমান দশ মিনিটের জন্য বেরিয়ে গেল। ভাবলুম এই বেলা দরজা বন্ধ করে দি, না হলে আবার হয়ত কিছু একটা নিয়ে আসবে। আস্ত উটের রোস্টটা হয়ত দিতে ভুলে গিয়েছে।
ততক্ষণে আবদুর রহমান পুনরায় হাজির। এবার এক হাতে থলে-ভর্তি বাদাম আর আখরোট, অন্য হাতে হাতুড়ি। ধীরে সুস্থে ঘরের এককোণে পা মুড়ে বসে বাদাম আখরোটের খোসা ছাড়াতে লাগল৷
এক মুঠো আমার কাছে নিয়ে এসে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে বলল, ‘আমার রান্না হুজুরের পছন্দ হয়নি।'
‘কে বলল, পছন্দ হয়নি?”
‘তবে ভালো করে খেলেন না কেন?'
আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, 'কী আশ্চর্য, তোমার বপুটার সঙ্গে আমার তনুটা মিলিয়ে দেখো দিকিনি- তার থেকে আন্দাজ করতে পারো না, আমার পক্ষে কি পরিমাণ খাওয়া সম্ভবপর?
আবদুর রহমান তর্কাতর্কি না করে ফের সেই কোণে গিয়ে আখরোট বাদামের খোসা ছাড়াতে লাগল ।

তারপর আপন মনে বলল, 'কাবুলের আবহাওয়া বড়ই খারাপ। পানি তো পানি নয়।, সে যেন গালানো পাথর। পেটে গিয়ে এক কোণে যদি বসল তবে ভরসা হয় না আর কোনো দিন বেরুবে। কাবুলের হাওয়া তো হাওয়া নয়- আতসবাজির হল্কা। মানুষের ক্ষিদে হবেই বা কি করে।’
আমার দিকে না তাকিয়েই তারপর জিজ্ঞেস করল, 'হুজুর কখনো পানশির গিয়েছেন?'
‘সে আবার কোথায়?'
‘উত্তর-আফগানিস্তান। আমার দেশ- সে কী জায়গা! একটা আস্ত দুম্বা খেয়ে এক ঢোক পানি খান, আবার ক্ষিদে পাবে। আকাশের দিকে মুখ করে একটা লম্বা দম নিন, মনে হবে তাজি ঘোড়ার সঙ্গে বাজি রেখে ছুটতে পারি। পানশিরের মানুষ তো পায়ে হেঁটে চলে না, বাতাসের ওপর ভর করে যেন উড়ে চলে যায় ।
‘শীতকালে সে কী বরফ পড়ে! মাঠ পথ পাহাড় নদী গাছপালা সব ঢাকা পড়ে যায়, ক্ষেত খামারের কাজ বন্ধ,বরফের তলায় রাস্তা চাপা পড়ে গেছে। কোনো কাজ নেই, কর্ম নেই, বাড়ি থেকে বেরনোর কথাই ওঠে না। আহা সে কি আরাম! লোহার বারকোশে আঙার জ্বালিয়ে তার ওপর ছাই ঢাকা দিয়ে কম্বলের তলায় চাপা দিয়ে বসবেন গিয়ে জানালার ধারে। বাইরে দেখবেন বরফ পড়ছে, বরফ পড়ছে পড়ছে, পড়ছে- দু দিন, তিন দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন ধরে। আপনি বসেই আছেন, আর দেখছেন চে তৌর বর্ষ ববারদ- কি রকম বরফ পড়ে।'
আমি বললুম, ‘সাত দিন ধরে জানালার কাছে বসে থাকব?’
আবদুর রহমান আমার দিকে এমন করুণভাবে তাকালো যে, মনে হলো এ রকম বেরসিকের পাল্লায় সে জীবনে আর কখনো এতটা অপদস্থ হয়নি। ম্লান হেসে বলল, ‘একবার আসুন, জানালার পাশে বসুন, দেখুন। পছন্দ না হয়, আবদুর রহমানের গর্দান তো রয়েছে।'
খেই তুলে নিয়ে বলল, ‘সে কত রকমের বরফ পড়ে। কখনো সোজা, ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা তুলোর মতো, তারি ফাঁকে ফাঁকে আসমান জমিন কিছু কিছু দেখা যায়। কখনো ঘুরঘট্টি ঘন,— চাদরের মতো নেবে এসে চোখের সামনে পর্দা টেনে দেয়। কখনো বয় জোর বাতাস, প্রচণ্ড ঝড়। বরফের পাঁজে যেন সে-বাতাস ডাল গলাবার চর্কি চালিয়ে দিয়েছে। বরফের গুঁড়ো ডাইনে বাঁয়ে উপর নিচে এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি লাগায়- হু হু করে কখনো একমুখে হয়ে তাজি ঘোড়াকে হার মানিয়ে ছুটে চলে। কখনো সব ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু শুনতে পাবেন সোঁ-ওঁ-ওঁ- তার সঙ্গে আবার মাঝে মাঝে যেন দারুল আমানের ইঞ্জিনের শিটির শব্দ। সেই ঝড়ে ধরা পড়লে রক্ষে নেই, কোথা থেকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে, না হয় বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাবেন বরফের বিছানায়, তারই উপর জমে উঠবে ছ হাত উঁচু বরফের কম্বল- গাদা গাদা, পাঁজা পাঁজা। কিন্তু তখন সে বরফের পাঁজা সত্যিকার কম্বলের মতো ওম দেয়। তার তলায় মানুষকে দু দিন পরেও জ্যান্ত পাওয়া গিয়েছে।
একদিন সকালে ঘুম ভাঙলে দেখবেন বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সূর্য উঠেছে— সাদা বরফের উপর সে রোশনির দিকে চোখ মেলে তাকানো যায় না। কাবুলের বাজারে কালো চশমা পাওয়া যায়, তাই পরে তখন বেড়াতে বেরোবেন। যে হাওয়া দম নিয়ে বুকে ভরবেন তাতে একরত্তি ধুলো নেই,বালু নেই, ময়লা নেই ছুরির মতো ধারাল ঠান্ডা হাওয়া নাক মগজ গলা বুক চিরে ঢুকবে, আবার বেরিয়ে আসবে ভিতরকার সব ময়লা ঝেঁটিয়ে নিয়ে । দম নেবেন, ছাতি এক বিঘৎ ফুলে উঠবে- দম ফেলবেন এক বিঘৎ নেমে যাবে। এক এক দম নেওয়াতে এক এক বছর আয়ু বাড়বে- এক একবার দম ফেলাতে একশটা বেমারি বেরিয়ে যাবে।
‘তখন ফিরে এসে, হুজুর একটা আস্ত দুম্বা যদি না খেতে পারেন, তবে আমি আমার গোঁফ কামিয়ে ফেলব। আজ যা রান্না করেছিলুম তার ডবল দিলেও আপনি ক্ষিদের চোটে আমায় কতল করবেন।’
আমি বললুম, 'হ্যাঁ আবদুর রহমান তোমার কথাই সই। শীতকালটা আমি পানশিরেই কাটাব।'
আবদুর রহমান গদগদ হয়ে বলল, ‘সে বড়ো খুশি বাৎ হবে হুজুর।
আমি বললুম, ‘তোমার খুশির জন্য নয়, আমার প্রাণ বাঁচাবার জন্য।’
আবদুর রহমান ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকালো।
আমি বুঝিয়ে বললুম, 'তুমি যদি সমস্ত শীতকালটা জানালার পাশে বসে কাটাও তবে আমার রান্না করবে কে?'

পাঠ-পরিচিতি
‘প্রবাস বন্ধু' সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে গ্রন্থের পঞ্চদশ অংশ। প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের ভূমি, পরিবেশ; সেখানকার মানুষ ও তাদের সহজ-সরল জীবনাচরণ, বিচিত্র খাদ্য ইত্যাদি হাস্যরসাত্মকভাবে এই রচনায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখকের আফগানিস্তান ভ্রমণের আংশিক অভিজ্ঞতার পরিচয় আছে এখানে। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের সন্নিকটে খাজামোল্লা নামক গ্রামে বাসের সময় আবদুর রহমান নামের একজন তাঁর দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। আফগান আবদুর রহমান চরিত্রের মধ্যে সরলতা, স্বদেশপ্রেম, অতিথিপরায়ণতা ফুটে উঠেছে। আবদুর রহমানের রান্না ও পরিবেশন করা খাবারের মধ্যে আফগানিস্তানের বিচিত্র ও সুস্বাদু খাদ্যবস্তুর পরিচয় পাওয়া যায়। আফগানিস্তানের প্রস্তরভূমি এবং একই সঙ্গে নিকট-প্রতিবেশী এই জনপদের বরফ- শীতল জলবায়ু আকর্ষণীয়। ‘প্রবাস বন্ধু’ গল্পটি আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জীবন ও জগৎ, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ভাবতে শেখায়।                                                                                                                                           

উত্তর :
 ‘ও রভোয়া’ অর্থ আবার দেখা হবে বা বাক্যবন্ধ।


উত্তর : লেখকের কাজের লোকের নাম আবদুর রহমান।

উত্তর : খাজামোল্লা গ্রাম কাবুল থেকে আড়াই মাইল দূরে।

উত্তর : লেখক শীতকাল পানশিরে কাটাবেন বলেছেন।

উত্তর :  অধ্যক্ষ জিরার মন্ত্রীর দফতরে ঝগড়া-বচসা করেন।


উত্তর :
 চাকর আবদুর রহমানের গুণকীর্তন করে অধ্যক্ষ জিরার আলোচ্য উক্তিটি করেন।লেখক আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে আড়াই মাইল দূরে খাজামোল্লা গ্রামে বসবাসের জন্য বাসা পেলেন। বাসার সঙ্গে তিনি কাজকর্ম করার জন্যে একজন চাকরও পেলেন। বাসার ব্যবস্থাকারী অধ্যক্ষ জিরার সাহেব জাতে ফরাসি। তাই তিনি ফরাসি রীতি অনুসারে কায়দামাফিক চাকর আবদুর রহমানের সঙ্গে লেখকের পরিচয় করিয়ে দিলেন। চাকর আবদুর রহমানের গুণকীর্তন করে তিনি বলেন যে, সে সকল কাজেই খুব দক্ষ। জুতো বুরুশ বা রং করা থেকে খুনখারাবির মতো কঠিন কাজেও সে সমান পারদর্শী। 


উত্তর :
 লেখকের সঙ্গে তার জন্য নতুন বাসার সঙ্গে ঠিক করা চাকর আবদুর রহমানের পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে অধ্যক্ষ জিরার সাহেব একথা বলেছেন। 
আবদুর রহমান সম্পর্কে জিরার সাহেবের মূল্যায়ন হলো তিনি ‘হরফন-মৌলা’ বা ‘সকল কাজের কাজি’। অর্থাৎ আবদুর রহমান পারে না এমন কোনো কাজ নেই। লেখকের সব ধরনের প্রয়োজনেই সে সহযোগিতা করতে পারবে।


উত্তর :
 ফরাসি অধ্যক্ষ জিরার সাহেব সম্পর্কে লেখকের ধারণা তিনি খুব কাজের লোক। সারাদিন নানা রকমের কাজ করে বেড়ান। জিরার সাহেবের কাজ হলো সারাদিন কোনো না কোনো মন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে ঝগড়া আর তর্ক করে সময় পার করা। দাপ্তরিক কাজে জিরার সাহেবকে বিভিন্ন মন্ত্রীর দপ্তরে যাতায়াত করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার মতের সঙ্গে অন্যদের মেলে না বলে তর্ক-বিতর্ক বেঁধে যায়।



উত্তর :
আবদুর রহমানের বিশালদেহ বুঝাতে আলোচ্য উক্তিটি করা হয়।কাবুল শহরে লেখক দু’জন দানবের মতো বিশালদেহী শক্তিমান মানুষের দেখা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন জিরার সাহেবের ঠিক করে দেয়া বাসার চাকর আবদুর রহমান। ছ’ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার আবদুর রহমান চওড়ায়ও কম নয়। দুখানা হাত হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। আঙুলগুলোদেখলে মনে হয় বুঝি দু কাঁদি মর্তমান কলা ঝুলছে। পা দুখানা ডিঙি নৌকার সাইজ। কাঁধ বিশাল, আর এক কান থেকে অন্য কান পর্যন্ত বিস্তৃত মুখে ইচ্ছে করলে চওড়াচওড়ি কলা গিলতে পারবে। এবড়ো-থেবড়ো নাকের আবদুর রহমানের কপাল আর মাথা তুলনায় বেশ ছোট।



উত্তর :
 চাকর আবদুর রহমানের বিশাল দেহ ও সুগঠিত শরীর দেখে লেখকের মনে হলো সে যদি চাকর না হয়ে আমীর বা আফগানিস্তানের রাজা হতো তবে অনায়াসেএদেশের ভার নিজের কাঁধে বইতে পারতো। লেখক রসিকতা করে চাকর আবদুর রহমান সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছেন। আবদুর রহমানের বিশাল দেহ, দেখতেও বেশ  রাজসিক। শারীরিক গড়নে তা সামান্য চাকর বলে মনে হয় না।




Score Board
Score Board