তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
                                                     শামসুর রাহমান

কবি-পরিচিতি
নাম: শামসুর রাহমান।
জন্ম পরিচয়
জন্মতারিখ : ২৪ অক্টোবর, ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ।  জন্মস্থান : মাহুতটুলীব, ঢাকা।  পৈতৃক নিবাস : পাড়াতলী গ্রাম, রায়পুরা, নরসিংদী। 
পিতার নাম : মোখলেসুর রহমান চৌধুরী।  মাতার নাম : আমেনা খাতুন।
শিক্ষাজীবন
মাধ্যমিক : পোগোজ স্কুল (১৯৪৫), ঢাকা।  উচ্চ মাধ্যমিক : ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (১৯৪৭)। উচ্চতর : বিএ (অনার্স), এমএ (ইংরেজি); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
পেশা সাংবাদিকতা।  সম্পাদক : দৈনিক বাংলা। সভাপতি : বাংলা একাডেমি।
সাহিত্যকর্ম
কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ, নিজ বাসভূমে, বন্দী শিবির থেকে, দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এক ধরনের অহংকার,আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে, আমি অনাহারি, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে,বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়, গৃহযুদ্ধের আগে, হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো, হরিণদের হাড়, মানব হৃদয়ে নৈবদ্য সাজাই, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
উপন্যাস : অক্টোপাস, নিয়ত মন্তাজ, অদ্ভুত আঁধার এক, এলো সে অবেলায়।  প্রবন্ধ : আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ। শিশুতোষ : এলাটিং বেলাটিং, ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো, গোলাপ ফোটে খুকির হাতে, রংধনু সাঁকো, লাল ফুলকির ছড়া।
অনুবাদ : ফ্রস্টের কবিতা, হ্যামলেট, ডেনমার্কের যুবরাজ।
সম্পাদনা : হাসান হাফিজুর রহমানের অপ্রকাশিত কবিতা।
পুরস্কার ও সম্মাননা: আদমজী পুরস্কার (১৯৬৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯), একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯১)।
মৃত্যু: ১৭ আগস্ট, ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ।

 মূলপাঠ
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা 
তোমাকে পাওয়ার জন্যে🔒ব্যাখ্যা
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?🔒ব্যাখ্যা 
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?🔒ব্যাখ্যা

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা, 
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল,🔒ব্যাখ্যা 
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।🔒ব্যাখ্যা
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো🔒ব্যাখ্যা
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে🔒ব্যাখ্যা
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। 🔒ব্যাখ্যা রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র। 🔒ব্যাখ্যা
তুমি আসবে বলে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম। 🔒ব্যাখ্যা
তুমি আসবে বলে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার 
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর। 🔒ব্যাখ্যা
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতা-মাতার লাশের উপর।🔒ব্যাখ্যা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন? 
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে থুথুড়ে এক বুড়ো
উদাস দাওয়ায় বসে আছেন🔒ব্যাখ্যা তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, 🔒ব্যাখ্যা বাতাসে নড়ছে চুল।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধরে দগ্ধ ঘরের।🔒ব্যাখ্যা

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে 
বসে আছে পথের ধারে।🔒ব্যাখ্যা

তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,🔒ব্যাখ্যা  
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা, 🔒ব্যাখ্যা
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে, 🔒ব্যাখ্যা
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস 
এখন পোকার দখলে 🔒ব্যাখ্যা
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজি তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে- 🔒ব্যাখ্যা
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা। 🔒ব্যাখ্যা

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে, 
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক 
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা। 🔒ব্যাখ্যা

পাঠ-পরিচিতি

‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' শীর্ষক কবিতাটি শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা নামক কাব্য থেকে নেওয়া হয়েছে।  কবিতাটি কবির বন্দী শিবির থেকে নামক কাব্যের অন্তর্ভুক্ত।  স্বাধীনতা শুধু শব্দমাত্র নয়, এটি এমন এক অধিকার ও অনুভব যা মানুষের জন্মগত।  কিন্তু এই অধিকার আদায়ের জন্য বাঙালি জাতিকে দীর্ঘ কাল যেমন সংগ্রাম করতে হয়েছে তেমনি করতে হয়েছে অপরিসীম আত্মত্যাগ ৷ ১৯৭১ সালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে আপামর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধচলাকালে বাঙালির রক্তে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয় পাকিস্তানি যুদ্ধবাজরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে সকিনা বিবির মতো গ্রামীণ নারীর সহায়-সম্বল-সম্ভ্রম বিসর্জিত হয়েছে, হরিদাসী হয়েছে স্বামীহারা, নবজাতক হারিয়েছে মা-বাবাকে।  পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ছাত্রাবাস আক্রমণ করে ছাত্রদের হত্যা করে, শহরের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গণহত্যা চালায়, পুড়িয়ে দেয় গ্রাম ও শহরের লোকালয়।  এর প্রাকৃতিক প্ৰতিবাদ ওঠে পশুর কণ্ঠেও।  আর্তনাদ করে কুকুরও। মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, জেলে, রিক্শাওয়ালা প্রমুখ সাধারণ মানুষ আত্মত্যাগ করে । দগ্ধ হওয়া লোকালয় প্রবীণ বাঙালির আলোকিত চোখে অগ্নি ঝরায়। সেইসঙ্গে নবীন রক্তে প্রাণস্পন্দন ও আশা জেগে থাকতে দেখে কবি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন- এত আত্মত্যাগ যার উদ্দেশ্যে সেই স্বাধীনতাকে বাঙালি একদিন ছিনিয়ে আনবেই। কবিতাটি মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য সাহিত্যিক দলিল।                                                                   

উত্তর :  প্রভুর বাস্তুভিটায় ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করেছিল একটা কুকুর।

উত্তর :   অনাথ কিশোরী থালা হাতে পথের ধারে বসেছিল। 

উত্তর : ‘স্বাধীনতা’ মানুষের জন্মগত অধিকার।


উত্তর :  দানবের মতো চিৎকার করতে করতে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এসেছিল।

উত্তর : অধীর আগ্রহে সবাই বসে আছে স্বাধীনতার প্রতীক্ষায়।

উত্তর :  হরিদাসীর সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল।

উত্তর :
 ঢাকার রিকশাওয়ালা রুস্তম শেখের ফুসফুস এখন পোকার দখলে।


উত্তর : দগ্ধ ঘরের নড়বড়ে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোল্লাবাড়ির এক বিধবা।


উত্তর :
স্বাধীনতা কেবল একটি শব্দ নয় বরং স্বাধীনতা এমন এক অধিকার ও অনুভব, যা মানুষের জন্মগত।
স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা প্রত্যেকটি মানুষের নৈতিক অধিকার। কেননা প্রতিটি মানুষ স্বাধীন ও মুক্তভাবে বেঁচে থাকতে চায়। এ স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্যে বাঙালিকে অত্যাচারিত হতে হয়েছে, যা আলোচ্য বাক্যে ফুটে উঠেছে।


উত্তর :
 স্বাধীনতা বাংলার মানুষের প্রাণের দাবি আর এজন্য তারা বারবার রক্তগঙ্গায় ভেসেছে।
পরাধীনতা মানুষের জীবনকে অভিশপ্ত করে তোলে। এ অভিশাপের নাগপাশ থেকে সকলেই মুক্তি পেতে চায়। বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের কাছে পরাধীন ছিল। এ পরধীনতার শৃঙ্খল  ভাঙতে তারা বিদ্রোহ করেছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের ওপর পৈশাচিক নৃশংসতা চালিয়েছিল। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছিল। রক্তের গন্ধে সারাদেশ দূষিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের সংকল্প থেকে ফেরেনি। বারবার রক্তগঙ্গায় হাবুডুবু খেয়েছে। এ কারণেই কবি খেদোক্তি করেছেন- “আর কতবার ভাসেত হবে রক্তগঙ্গায়।”


উত্তর :
খা-বদাহন’ শব্দটির মধ্য দিয়ে পৌরাণিক ঘটনার অবতারণা করে  ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় কবি ভিনদেশি শত্রুদের দ্বারা বাংলাদেশকে জ্বালিয়ে ছারখার করার বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন।পুরাণ অনুসারে দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণের সহযোগিতায় অর্জুন খা-বদাহন করেছিলেন। এর ফলে সকল প্রাণীসহ নিঃশেষ হয়েছিল সেই বন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীও এদেশে ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এ বিষয়টি বোঝাতেই কবি ‘খা-বদাহন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। 



উত্তর :
 ‘আর কতবার দেখতে হবে খা-বদাহন’Ñ কবির এমন প্রশ্নের কারণ, বহুবার বাঙালি জাতি বিদেশি শত্রুর আক্রমণের শিকার হয়েছে। 
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তা এক দিনে হয়নি। ১৭৫৭ সালে পলাশির প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। তারপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে বাঙালিকে। বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তরে রক্ত দিয়েছে বাংলার মানুষ। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। এদেশের স্বাধীনতার জন্য অনেকবার অগ্নিকা-ে জ্বলতে হয়েছে মানুষকে। জ্বলেছে মানুষের আশ্রয়ও। তাই কবি মহাভারতে বর্ণিত ‘খা-ব’ বন যা ভীষণ-অগ্নিকা-ে পুড়েছিল সেই উপমায় এ দেশের মানুষের দুর্দশার কথা বলেছেন। প্রশ্ন করেছেন, আর কত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে বাঙালিকে?


উত্তর :
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সাকিনা বিবির কপাল ভেঙেছিল। স্বাধীনতা প্রাপ্তি মানুষের নৈতিক ও জন্মগত অধিকার। কিন্তু পাকিস্তানিরা বাঙালির স্বাধীনতা খর্ব করতে চেয়েছিল। যে কারণে বাঙালিরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং স্বাধীনতার জন্য অনেক জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছিল। এমনিভাবে স্বাধীনতার জন্য সাকিনা বিবির মতো গ্রামীণ নরীর সহায়-সম্বল-সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়েছিল।  



Score Board

১) স্বাধীনতার জন্য কপাল ভাঙল কার?

২) “তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা” কবিতায় কুকুরের আর্তনাদ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

৩) ‘অপরাহ্ণ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো-

৪) ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি কে?

৫) শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক- কিসের প্রতীক?

Score Board