যাব আমি তোমার দেশে

যাব আমি তোমার দেশে
                      জসীমউদ্‌দীন

কবি-পরিচিতি
নাম : জসীমউদ্দীন।
জন্ম ও পরিচয়:
জন্ম তারিখ : ১লা জানুয়ারি, ১৯০৩ সাল।
জন্মস্থান : ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে মাতুলালয়। পিতৃভূমিগোবিন্দপুর গ্রাম।   পিতা : মৌলবি আনসার উদ্দিন আহমদ।
শিক্ষাজীবন
মাধ্যমিক : এস.এস.সি., ফরিদপুর জিলা স্কুল। 
উচ্চমাধ্যমিক : এইচ.এস.সি., রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। 
উচ্চতর শিক্ষা : বি.এ. (পাশ), রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর। এম.এ. ও রেছেন এ কাবতায়। (বাংলা), ১৯৩১ খ্রি., কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
পেশা ও কর্মজীবন:
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন । ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রাদেশিক সরকারের প্রচার বিভাগের পাবলিসিটি অফিসার নিযুক্ত হন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পর তিনি আমৃত্যু সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন।
সাহিত্যকর্ম কাহিনিকাব্য : নক্সী-কাঁথার মাঠ, সোজনবাদিয়ার ঘাট, সখিনা, মা যে জননী কান্দে। 
খণ্ডকাব্য : রাখালী, বালুচর, ধানখেত, রূপবতী, মাটির কান্না ইত্যাদি।
গদ্যগ্রন্থ  : যাদের দেখেছি, 'জীবনকথা, ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়, বোবা কাহিনী।
ভ্রমণকাহিনি : চলে মুসাফির।
শিশুতোষ রচনা : হাসু, এক পয়সার বাঁশি, ডালিম কুমার, বাঙালির হাসির গল্প ইত্যাদি। 
নাটক  : পদ্মাপার, বেদের মেয়ে, মধুমালা, বাঁশের বাঁশি, পল্লিবধূ ইত্যাদি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
একুশে পদক (১৯৭৬), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি।
জীবনাবসান : ১৩ই মার্চ, ১৯৭৬ সাল।

মূলপাঠ 
পল্লি-দুলাল, ভাই গো আমার যাব আমি তোমার দেশে,
আকাশ যাহার বনের শীষে দিক হারা মাঠ চরণ ঘেঁসে।
দূর দেশীয় মেঘ-কনেরা মাথায় লয়ে জলের ঝারি,
দাঁড়ায় যাহার কোলটি ঘেঁসে বিজলী পেড়ে আঁচল নাড়ি।
বেতস কেয়ার বনে যেথায় ডাহুক মেয়ে আসর মাতায়,
পল্লি-দুলাল ভাই গো আমার, যাব সেথায়।🔒ব্যাখ্যা
তোমার দেশে যাব আমি, দীঘল বাঁকা পন্থখানি,
ধান কাউনের ক্ষেতের ভেতর সরু সুতোর আঁচড় টানি,
গিয়াছে সে হাবা মেয়ের এলো মাথার সিঁথির মতো
কোথাও সিধে কোথাও বাঁকা গরুর গায়ের রেখায় ক্ষত।
গাজন-তলির মাঠ পেরিয়ে শিমুলডাঙা বনের বায়ে;
কোথাও গাঁয়ের রোদ মাখিয়া ঘুম-ঘুমায়ে গাছের ছায়ে।
 
তাহার পরে মুঠি ছড়িয়ে দিয়ে কদম-কলি,
কোথাও মেলে বনে পাতা গ্রাম্য মেয়ে যায় যে চলি।
সে পথ দিয়ে যাব আমি পল্লি-দুলাল তোমার দেশে,
নাম না জানা ফুলের সুবাস বাতাসেতে আসবে ভেসে।
তোমার সাথে যাব আমি, পাড়ার যত দস্যি ছেলে,🔒ব্যাখ্যা
তাদের সাথে দল বাঁধিয়া হেথায় সেথায় ফিরব খেলে।
ধল-দীঘিতে সাঁতার কেটে আনব তুলে রক্ত-কমল,
শাপলা লতায় জড়িয়ে চরণ ঢেউ-এর সাথে খাব যে দোল।
হিজল-ঝরা জলের ছিটায় গায়ের বরণ রঙিন হবে
খেলবে দীঘির ঝিলিমিল মোদের লীলা কালোৎসবে।
তোমার দেশে যাব আমি পল্লি-দুলাল ভাই গো সোনার,
সেথায় পথে ফেলতে চরণ লাগবে পরশ এই মাটি-মার🔒ব্যাখ্যা
ডাকব সেথা পাখির ডাকে, ভাব করিব পাখির সনে
অজান ফুলের রূপ দেখিয়া মানবো তারে বিয়ের কনে।🔒ব্যাখ্যা
চলতে পথে ময়না কাঁটায় উত্তরীয় জড়িয়ে যাবে,
ইটেল মাটির হোঁচট লেগে আঁচল হতে ফুল ছড়াবে।
পল্লি-দুলাল, যাব আমি- যার আমি তোমার দেশে,
তোমার কাঁধে হাত রাখিয়া ফিরবো মোরা উদাস বেশে।
বনের পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখব মোরা সাঁজ-বাগানে,
ফুল ফুটেছে হাজার রঙের মেঘ-তুলিকার নিখুঁত টানে।
গাছের শাখা দুলিয়ে আমি পাড়ব সে ফুল মনের আশে,
উত্তরীয় ছড়িয়ে তুমি দাঁড়িয়ে থেকো বনের পাশে।
যে ঘাটেতে ভরবে কলস গাঁয়ের বিভোল পল্লিবালা,
সে ঘাটেরি এক ধারেতে আসবো রেখে ফুলের মালা🔒ব্যাখ্যা
দীঘির জলে ঘট বুড়াতে পথে পাওয়া মাল্যখানি,
কুড়িয়ে নিয়ে ভাববে ইহা রেখে গেছে কেই না জানি।
চেনে না তার হাতের মালা হয়ত সে বা পরবে গলে,🔒ব্যাখ্যা
আমরা দুজন থাকব বসে ঢেউ দোলা সেই দীঘির কোলে।
চার পাশেতে বনের সারি এলিয়ে শাখার কুন্তল -ভার,
দীঘির জলে ঢেউ গণিবে ফুল শুঁকিবে পদ্ম পাতার।
বনের মাঝে ডাকবে ডাহুক, ফিরবে ঘুঘু আপন বাসে,
দিনের পিদীম ঢুলবে ঘুমে রাত জাগা কোন ফুলের বাসে🔒ব্যাখ্যা
চার ধারেতে বন জুড়িয়া রাতের আঁধার বাঁধবে বেড়া,
সেই কুহেলীর কালো কারায় দীঘির জলও পড়বে ঘেরা।
                                                                                                               

Score Board
Score Board